সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান সংঘাত কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড Brent Crude-এর মূল্য প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ৬ ডলার পর্যন্ত লাফ দিয়েছে।
এর আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থান এবং নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে চলতি বছরে তেলের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। সাম্প্রতিক হামলার পর সেই ঊর্ধ্বগতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
ইরান বৈশ্বিক চাহিদার ৫ শতাংশের কম তেল উৎপাদন করলেও বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশের বেশি পরিবহন হয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ Strait of Hormuz দিয়ে। এই প্রণালি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ সংকট তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় শিপিং কোম্পানি ওই পথে চলাচল স্থগিত করে বিকল্প রুট বেছে নিয়েছে।
হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের অভিযান অব্যাহত রাখবে। তিনি উল্লেখ করেন, শুরুতে ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ সময় ধরা হলেও প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
প্রাইস-ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গ্যাস স্টেশনগুলোতে খুচরা মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। রোববার থেকে জাতীয় গড় দাম বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের খুচরা মূল্য বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৭ দশমিক ৩৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ফলে কয়েক বছর ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক JPMorgan Chase-এর প্রধান নির্বাহী Jamie Dimon CNBC-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়বে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী না হলে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি নাও হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে।
মঙ্গলবার মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুতে বড় পতন দেখা গেলেও শেষদিকে কিছুটা স্থিতি ফিরে আসে। তবে ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনা ও মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় ২ শতাংশ বা ১০০ ডলারের বেশি বেড়েছে।
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ Qatar জানিয়েছে, তাদের কিছু অপারেটিং স্থাপনায় হামলার কারণে এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ঘোষণার পর ইউরোপে গ্যাসের দাম একপর্যায়ে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে মঙ্গলবার Brent Crude-এর মূল্য প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলারের ওপরে ওঠে, যা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। গত শুক্রবার থেকে হিসাব করলে মোট মূল্যবৃদ্ধি ১৫ শতাংশেরও বেশি।
ইউরোপীয় গ্যাস বাজারে একপর্যায়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়লেও পরে কিছুটা কমেছে। তবে সোমবারও তা উল্লেখযোগ্য হারে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। একই সঙ্গে চিনি, সার ও সয়াবিনের দামও বাড়তির দিকে রয়েছে।
ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ Iraq জানিয়েছে, তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে লোডিং পয়েন্টে পৌঁছাতে না পারলে কয়েক দিনের মধ্যে তারা দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে।
ইরাকি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, দেশটি ইতোমধ্যে রুমাইলা তেলক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৭ লাখ ব্যারেল এবং পশ্চিম কুরনা-২ ক্ষেত্র থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন হ্রাস করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে পাঁচটি জাহাজে হামলার পর টানা চতুর্থ দিনের মতো Strait of Hormuz দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আবার বাড়তে পারে। এতে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্ব তেল উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে থাকে।